আজ, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির যে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা সমগ্র জাতিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। যারা দুই বছর কলেজে পড়েছে, পরীক্ষার জন্য নিবন্ধনও সম্পন্ন করেছে, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি পরীক্ষা হলে উপস্থিত হয়নি। প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৬ জনের অনুপস্থিতি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত, যা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার জন্য আসলে দায়ী কে? পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা নাকি রাষ্ট্র—কে এর দায় নেবে? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর জন্য 'আমরা সবাই এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই সম্মিলিতভাবে দায়ী।' এটি কেবল একটি অংশের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা। অতীতে এসএসসি ও এইচএসসির পর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়লেও, এবারের মাদ্রাসা শিক্ষায় ৪৪ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ এবং সাধারণ শিক্ষায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি রীতিমতো উদ্বেগজনক এবং গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
এই উচ্চ হারে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির ওপর পড়বে। কারণ এইচএসসি সনদ উচ্চশিক্ষা, সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাওয়ার জন্যও অত্যাবশ্যক। শিক্ষাব্যবস্থার ওপর এই আস্থাহীনতা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এই শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে বসে থাকবে না, আবার সবাই কাজেও নিয়োজিত হতে পারবে না। তাহলে তারা কোথায় যাবে? অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আয়ের পথ হিসেবে এদের একটি অংশ কিশোর গ্যাং গঠন করতে পারে, যা এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে অপরাধজগতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মাদকাসক্তির হার বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতা, ব্যক্তিগত সমস্যা বা প্রস্তুতির অভাবকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও, এত বড় সংখ্যক অনুপস্থিতির পেছনে এগুলো তুচ্ছ অজুহাত। দরিদ্রতা বা বাল্যবিবাহ কিছু ক্ষেত্রে দায়ী হলেও, তা এই বিশাল সংখ্যাকে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং বিগত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা, মানসম্মত শিক্ষার অভাব এবং শিক্ষকের অনুপস্থিতি—এর মতো গভীরতর সমস্যাগুলো এই সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।