আজ রবিবার (১২ জুলাই, ২০২৬) ভোর ৫টার পর সুরমা-কুশিয়ারা নদী সংলগ্ন সুনামগঞ্জের অন্যতম বৃহৎ একটি হাওরে ঘটে যাওয়া এক অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা জনপদ। গত দুই ঘণ্টার মধ্যে হাওরের জলস্তর অস্বাভাবিক ও রহস্যজনকভাবে প্রায় দুই ফুট নিচে নেমে যাওয়ায় স্থানীয় মৎস্যজীবী ও কৃষকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভোরের আলো ফুটতেই মাছ ধরতে গিয়ে জেলেরা দেখতে পান, তাদের নৌকা কাদায় আটকে গেছে এবং হাওরের বিস্তীর্ণ অংশ রাতারাতি শুকিয়ে গেছে, যা বিগত প্রজন্মের স্মৃতিতেও নেই। এই আকস্মিক ঘটনা এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে এক নজিরবিহীন সংকটে ফেলে দিয়েছে।
হাওর পাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, এই সময়ে এমন জলস্তর পতন সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। সাধারণত বর্ষার প্রারম্ভে যখন হাওরগুলো পানিতে টইটম্বুর থাকে, তখন এমন দৃশ্য কেউ কল্পনাও করতে পারে না। হাজার হাজার টন মাছ কাদার মধ্যে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে, যা অঞ্চলের মৎস্য সম্পদের জন্য এক ভয়াবহ আঘাত। একইসাথে, বোরো ধান চাষের জন্য প্রস্তুত হওয়া জমিগুলোর সেচ ব্যবস্থা নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ইতিমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসন জরুরি বৈঠক ডেকেছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ভূতত্ত্ব ও পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দল ঘটনাস্থলে রওনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ কোনো ফাটল অথবা আকস্মিক ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলেই এই ঘটনা ঘটেছে, যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো অজানা।
ভূতত্ত্ববিদ ড. আহমেদ আলী, যিনি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, আজ সকালে এক প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন যথেষ্ট জটিল। তবে, এত দ্রুত ও ব্যাপক জলস্তর পতন কেবল ভূপৃষ্ঠের নিচে বড় ধরনের ফাটল বা সুড়ঙ্গ তৈরি হলেই সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভূগর্ভস্থ পানির সঞ্চালনে পরিবর্তনও একটি কারণ হতে পারে, কিন্তু এটি আরও গভীর গবেষণার দাবি রাখে।” তিনি আরও যোগ করেন, এই ঘটনা হাওরের বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা আগামীতে আরও মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত হতে পারে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপ ও বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি এই পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে সুনামগঞ্জের এই বৃহৎ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে এবং কৃষি খাতেও আসন্ন ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। পুরো এলাকায় এক চাপা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, যেখানে সবাই তাকিয়ে আছে একটি দ্রুত সমাধানের দিকে।