বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ভোর থেকেই সারাদেশের অন্তত ১২টি জেলায় একযোগে শুরু হয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব সাঁড়াশি অভিযান। পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ দলগুলো দেশের বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকায় অতর্কিত অভিযান চালিয়েছে। সকাল ৭টা বাজার আগেই বেশ কয়েকটি স্থানে অভিযান শেষ হয়েছে, যেখানে বহু বালু উত্তোলনকারীকে আটক করা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ অবৈধ ড্রেজিং সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে এবং লাখ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। বর্তমানে আরও কয়েকটি জেলায় অভিযান চলমান রয়েছে, যা দেশের পরিবেশ সুরক্ষা নীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পরিবেশ ধ্বংসকারী ও নদী গ্রাসকারী অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে সরকারের দীর্ঘদিনের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অসাধু উপায়ে এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। এর ফলে দেশের প্রধান নদীগুলো যেমন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার পাড় ভাঙছে, কৃষি জমি বিলীন হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপকে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় একটি বড় ধরনের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, এই সকালে গণমাধ্যমকে জানান, 'আমরা অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। এই অপকর্মের কারণে আমাদের নদীগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। আজকের অভিযান একটি পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে যে, রাষ্ট্র তার প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বদ্ধপরিকর।'
অভিযানে সিরাজগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, চাঁদপুর, গাইবান্ধা, জামালপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলার নদী অববাহিকায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক অবৈধ বালু ব্যবসায়ী অভিযান শুরু হওয়ার আগেই তাদের যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করলেও, প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে তা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে বালু সিন্ডিকেটের অত্যাচারে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দারা এই অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। মুন্সিগঞ্জের একজন গ্রামবাসী বলেন, 'অবশেষে সরকার আমাদের কথা শুনলো। নদী ভাঙনের ভয়ে আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল।' তবে কিছু বালু ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন যে, এতে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যদিও পরিবেশবিদরা বলছেন দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপ সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল আকস্মিক অভিযানই যথেষ্ট নয়; একটি টেকসই নীতিমালা প্রণয়ন, বালু ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা আবশ্যক। নির্মাণ খাতে এর প্রভাব নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জল্পনা শুরু হলেও, পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি সুস্থ পরিবেশ ও স্থিতিশীল অর্থনীতি নিশ্চিত করবে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযানকে চলমান রাখা হবে এবং নদী ব্যবস্থাপনায় আরও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে জোর দেওয়া হবে। আজকের ভোরবেলার এই কঠোর ও সুসমন্বিত পদক্ষেপ বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল বলে মনে করছেন অনেকে, যা ভবিষ্যতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় অনুপ্রেরণা জোগাবে।