ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর বাজার এখন আর কেবল একটি প্রান্তিক বাজার নয়, এটি যেন ড্রাগন ফলের এক জীবন্ত রাজধানী। আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগেও এই বাজারটি তার বর্তমান জৌলুস থেকে অনেক দূরে ছিল। কিন্তু ড্রাগন ফলের ব্যাপক চাষাবাদ ও বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গৌরীনাথপুর বাজার এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন এই বাজারে গড়ে ১ থেকে দেড় কোটি টাকার ড্রাগন ফল বেচাকেনা হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার করেছে।
এই বাজারের সফলতার মূলে রয়েছে শতাধিক পাইকারি আড়ত, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সুস্বাদু ড্রাগন ফল সরবরাহ করে। এসব আড়ত গড়ে ওঠার ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। জেলাজুড়ে বিদেশি এই ফলের চাষাবাদ দিনদিন বাড়ছে এবং একই সাথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখী। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত লাল টুকটুকে ফল বাজারে নিয়ে আসেন। আড়তগুলোতে চলে দিনভর দরদামের হাকডাক আর চলে নিরবচ্ছিন্ন বেচাকেনা।
স্থানীয় কৃষক শরিফুল ইসলাম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি পাঁচ বিঘা জমিতে ড্রাগনের আবাদ করেছি। জমি থেকে ফল তুলে সহজেই এই গৌরীনাথপুর বাজারে বিক্রি করতে পারি। এতে আমাদের পরিবহন খরচ অনেক কমেছে এবং ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও নেই বললেই চলে।’ তিনি আরও জানান, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, বাইসাইকেল এবং বস্তায় ভরে কৃষকেরা প্রতিদিন ফল নিয়ে এই বাজারে আসেন। একটি আড়তের হিসাবরক্ষক জাকির হোসেনের মতে, ‘এই বাজার গড়ে ওঠায় অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি আড়তে কাজ করে মাসে প্রায় ১৫-১৮ হাজার টাকা আয় করি। এছাড়াও ফলের পরিমাপ ও প্যাকেজিংয়ের জন্য আলাদা লোক কাজ করে, যারা প্রতি মাসে গড়ে ১২-১৫ হাজার টাকা উপার্জন করেন।’
নাটোর থেকে নিয়মিত ফল কিনতে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুস সামাদ এই বাজারের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘আমার মতো অনেক পাইকার এই বাজারে আসেন। এখানকার ব্যবসার পরিবেশ ও নিরাপত্তা খুবই সন্তোষজনক। দেশের অন্যান্য স্থানেও ড্রাগন ফল পাওয়া গেলেও গৌরীনাথপুর বাজারের ফলের মান তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো এবং দামও আমাদের নাগালের মধ্যেই থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রতি সপ্তাহে এই বাজার থেকে ফল কিনে ট্রেনে করে নাটোরে ফিরে যাই।’ পাইকারি ও খুচরা আড়তদার সাঈদ সরকার যোগ করেন, ‘বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরা এখানে এসে সহজে ব্যবসা করতে পারেন। এখান থেকে ফল ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরে সরবরাহ করা হয়। এখানকার ফলের আকার ও মান সত্যিই অসাধারণ।’