বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। আজ বুধবার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে, ইউজিসি দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা প্রায় দশ হাজার অমূল্য বই সংরক্ষণের মহৎ উদ্যোগ নিয়েছে। এই বিশাল সংগ্রহ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) গ্রন্থাগারে একটি বিশেষ কর্নার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অথবা পৃথক স্থানে সংরক্ষণ করা হবে, যা দেশের ভবিষ্যৎ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হবে।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, কবি আবদুল হাই শিকদার এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে নেওয়া হয়। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, "এটি কেবল একজন ব্যক্তির বইয়ের সংগ্রহ নয়, বরং দেশের জ্ঞান ও গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।" তিনি আরও জানান, এই বইগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ, তালিকাভুক্তকরণ এবং পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বইগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে, যেখানে ইউজিসি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বিশ্বাস করেন, এই উদ্যোগ ব্যক্তিগত গ্রন্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা দুর্লভ ব্যক্তিগত গ্রন্থ সংগ্রহ করে ওই অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণে ইউজিসির নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দেন। তার মতে, শুধু বই সংরক্ষণ নয়, দুর্লভ গ্রন্থগুলো ডিজিটাল আর্কাইভসেও সংরক্ষণ করা অপরিহার্য, যাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গবেষক ও পাঠক সহজে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও সহজে এই দুর্লভ সংগ্রহের সুবিধা নিতে পারবে।
কবি আবদুল হাই শিকদার জানান, তার সংগ্রহে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বিশ্ব ইতিহাস, গবেষণা, প্রবন্ধ, অনুবাদ সাহিত্য, শিশু সাহিত্য, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রায় ১০ হাজার বই রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার বই দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ অনেক বই বর্তমানে বাজারে দুষ্প্রাপ্য। তিনি জানান, তার সংগ্রহের একটি অংশ তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন এবং বাকি বই কয়েক দশক ধরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করেছেন। তার একান্ত ইচ্ছা, এই সম্পূর্ণ সংগ্রহ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা, যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা এসব বইয়ের জ্ঞান আহরণ করতে পারেন। ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মনীষীরা ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহের যে গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, তারই ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ দেশের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।