ফুটবল, কেবল একটি খেলা নয়, এটি শ্রমজীবী মানুষের একীভূত উন্মাদনা থেকে জন্ম নিয়ে আজ এক বৈশ্বিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী ক্লান্তিকর জীবনে শ্রমিকরা যখন একটি নির্দোষ যুদ্ধের আশ্রয় খুঁজেছিল, তখন থেকেই ফুটবলের বীজ রোপিত হয়। সময়ের ধাপে ধাপে এই খেলা কেবল শারীরিক শক্তির প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি মানুষের সমষ্টিগত মনস্তত্ত্ব, অহং, ভয়, প্রতিশোধ, স্বপ্ন, প্রেম আর পরাজয়ের এক গোপন ব্যাকরণ হয়ে উঠেছে। ফুটবল যেন মানব ইতিহাসের গভীরে জমে থাকা এক আদিম উন্মাদনাকে চার বছর পরপর নতুন করে জাগিয়ে তোলে, যা আজও বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে।
বিশ্বকাপ ফুটবল বা কোপা আমেরিকার মতো বড় আসর এলেই বাংলাদেশে যেন এক অন্য আবহ তৈরি হয়। শহরের রাতগুলো হয়ে ওঠে উৎসবমুখর, মুখে রং মাখা, বাড়ির ছাদে ওড়ে ভিনদেশী পতাকা, এমনকি সম্পর্কের মধ্যেও শুরু হয় ছোটখাটো শীতল যুদ্ধ। মুহূর্তের জন্য মানুষ ভুলে যায় তার শ্রেণি, পেশা বা মতাদর্শের ভেদাভেদ; গোলপোস্টের দুই প্রান্তে তখন কেবল আবেগ আর ভালোবাসা। 'বাঙালি আর ফুটবল' যেন এক চিরন্তন প্রেমের গল্প। সময়ের হাত ধরে এই ফুটবল শুধু ছড়িয়েই পড়েনি, এটি দেশের মানুষের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, যেখানে উন্মাদনার ধরনে এসেছে 'একাল' আর 'সেকালের' দৃশ্যপটের বিশাল পরিবর্তন।
সেই একাল-সেকালের দৃশ্যপটে পাড়ার নির্জনতা ভেঙে হঠাৎ ভেসে আসা 'গোওওওল!' চিৎকার আজও কানে বাজে। মুহূর্তেই পুরো এলাকার নীরবতা চুরমার করে দিয়ে বাড়ির ছাদ থেকে ভেসে আসে উল্লাস, রাস্তায় ভুভুজেলা বাজানো বা প্রিয় দলের গোল খাওয়া দেখে টিভির সামনে মলিন মুখে বসে থাকার দৃশ্য আজও অমলিন। ফুটবল মানেই এই নির্ভেজাল উল্লাস আর বাঁধভাঙা উত্তেজনা। মানুষ যখন টেলিভিশনের সামনে বসে খেলা দেখে, তখন তার ভেতরে এক অদ্ভুত ব্যক্তিগত আবেগ জেগে ওঠে, যেন মাঠে দৌড়ানো খেলোয়াড়টি তার নিজেরই প্রতিনিধি। খেলাধুলা তখন আর শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি হয়ে ওঠে জাতি, রাষ্ট্র, এমনকি রাজনৈতিক মানচিত্রেরও ভাষা।
কখনো কখনো মনে হবে একেকটি গোল যেন ইতিহাসের জমে থাকা অভিমান, একেকটি ম্যাচ যেন ছোট আকারের কূটনীতি। একসময় পৃথিবীর শিশুদের কাছে ফুটবলের রাজা ছিলেন দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর কালোমানিক পেলে। তার পায়ের জাদুতে ব্রাজিল পেয়েছিল এক নতুন পৌরাণিক মর্যাদা। পেলেই যেন বিশ্বকে প্রথম বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে, একটি দরিদ্র দেশও তার মেধা আর ঐকান্তিকতা দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করতে পারে। ফুটবল সেই সময় থেকেই মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।