সম্প্রতি প্রকাশিত ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে আবারও বিশ্বের সবচেয়ে অবাসযোগ্য শহরের তালিকায় উঠে এসেছে রাজধানী ঢাকার নাম। এই আন্তর্জাতিক র্যাংকিং নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের নগর-পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামগ্রিক উন্নয়ন-দর্শনের প্রতি একটি নির্মম আয়না। বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে রাজধানী ঢাকার অবস্থান ১৭১তম, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপোলির পরেই। একটি স্বাধীন দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ঢাকার এই অবস্থান নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইআইইউ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো, স্থিতিশীলতা এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশ—এই পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে প্রতি বছর বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকা প্রকাশ করে। এ বছরের তালিকায় ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর হিসেবে তার স্থান ধরে রেখেছে। এছাড়া ভিয়েনা, মেলবোর্ন, ভ্যাঙ্কুভার ও টোকিওও শীর্ষ অবস্থানগুলোতে রয়েছে। এই শহরগুলোর সাফল্যের পেছনে শুধু উন্নত অর্থনীতিই নয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিকেন্দ্রীকরণ, উন্নত গণপরিবহন, কার্যকর নাগরিক সেবা এবং সুশাসনের সমন্বয় কাজ করেছে। কিন্তু ঢাকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশের মোট ভৌগোলিক আয়তনের সামান্য অংশ দখল করলেও, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, সরকারি দপ্তর, করপোরেট অফিস, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, উন্নত হাসপাতাল, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়—সবকিছুই যেন ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কাজ, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে ঢাকায় আসছে, এবং অনেকে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করছে।
এই অসহনীয় জনচাপের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি অবকাঠামো, উন্নত হয়নি নাগরিক সেবা। ফলস্বরূপ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা, মারাত্মক বায়ুদূষণে শ্বাস নেওয়া, সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাতের অভাব, পার্ক ও খেলার মাঠের সংকট, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং অপর্যাপ্ত গণপরিবহন—সব মিলিয়ে ঢাকার জীবন ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। একটি মহানগরীর মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলোও যেন এখানে অধরা।
ঢাকার ওপর এই লাগামহীন চাপ কমানোর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পূর্বাচলকে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নগর হিসেবে গড়ে তোলা। সেখানে শুধু বাসস্থান নির্মাণ করলেই হবে না; কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অত্যাধুনিক অবকাঠামো, বিনোদন কেন্দ্র এবং সুপরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে হবে। পূর্বাচলকে একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে ঢাকা থেকে চাপ অনেকাংশে কমে আসবে এবং বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নগরায়ন সম্ভব হবে। নীতিনির্ধারক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নই পারে ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য।